কর ও ব্যয়ের চাপে আবাসন খাত, অনিশ্চয়তায় সাধারণ মানুষ, বাংলা সংবাদ মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সম্পাদকীয় ও মতামত

বাংলা সংবাদ

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

মানুষের বেঁচে থাকা এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের জন্য কয়েকটি মৌলিক চাহিদা অপরিহার্য। বাংলাদেশের সংবিধান ও সামাজিক বাস্তবতার আলোকে সাধারণত পাঁচটি মৌলিক মানবিক চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়- অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। এর মধ্যে বাসস্থান এমন একটি মৌলিক প্রয়োজন, যা শুধু মাথার ওপর একটি ছাদ নিশ্চিত করে না; বরং মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম সূচক হলো তার নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় আবাসন খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য একটি নিরাপদ বাসস্থান

ক্রমেই অধরা হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের আবাসন শিল্প শুধু একটি ব্যবসায়িক খাত নয়; এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আবাসন খাত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৬৯টি শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত। ইস্পাত, সিমেন্ট, সিরামিক, কাচ, বৈদ্যুতিক পণ্য, রং, স্যানিটারি সামগ্রী, আসবাবপত্র, পরিবহন, ব্যাংকিং, বীমা এবং প্রকৌশল সেবা সবকিছুই এই খাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

শুধু তাই নয়, আবাসন খাতের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন লক্ষাধিক শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, প্রকৌশলী, স্থপতি, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পেশার মানুষ। এদের বড় একটি অংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ফলে আবাসন খাতের সংকট কেবল কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

দুঃখজনকভাবে আবাসন খাত নিয়ে আলোচনা হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত বা বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি গুরুত্ব পায়। অথচ বাস্তবতা হলো, এই খাতের মূল ভোক্তা হচ্ছেন মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ, যারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট বা বাড়ির স্বপ্ন দেখেন। সাম্প্রতিক সময়ে নির্মাণ সামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি আবাসন খাতকে আরও চাপে ফেলেছে। এমএস (গঝ) রডের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি, টাইলস, স্যানিটারি সামগ্রী, রং এবং রড তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নির্মাণ ব্যয় বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফ্ল্যাট ও বাড়ির মূল্যের ওপর। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য আবাসন ক্রয় ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, নিবন্ধন ব্যয়ের উচ্চহার এবং বিভিন্ন ধরনের কর ও ফি। একদিকে জমির দাম বাড়ছে, অন্যদিকে নির্মাণ ব্যয়ও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নিরাপদ আবাসন সাধারণ

মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আবাসন খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো আবাসন ঋণের সীমিত সুযোগ এবং উচ্চ সুদের হার উন্নয়নশীল অনেক দেশে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদের হাউজিং ফাইন্যান্স ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ মানুষের জন্য আবাসন ঋণ সহজলভ্য নয়। ব্যাংক ঋণের জটিল শর্ত, উচ্চ সুদের হার এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনেক সম্ভাব্য ক্রেতাকে নিরুৎসাহিত করে।

অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আবাসন সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। নদীভাঙন, উপকূলীয় ক্ষয়, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হচ্ছে। বাস্তুচ্যুত এসব মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে, যা নগরাঞ্চলে আবাসনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বড় শহরগুলোতে এই চাপ দিন দিন বাড়ছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ব্যয় কমানোর দাবি থাকলেও তা গুরুত্ব পায়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর আরোপের প্রস্তাব এসেছে। যৌথ উন্নয়ন (জয়েন্ট ভেঞ্চার) প্রকল্পে জমির মালিকরা ডেভেলাপারের কাছ থেকে যে ফ্ল্যাট পাবেন, তার ওপর ১৫ শতাংশ নতুন কর আরোপের প্রস্তাব এই খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। একইভাবে সাইনিং মানির ওপর পূর্বের ১৫ শতাংশ কর বহাল রাখা হয়েছে। অথচ এই খাতে একটি সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালার অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগও বাজেটে বহাল রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট কর প্রদান করে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হলেও এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং প্রকৃত করদাতাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। অন্যদিকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বাজেট বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই হবে না; এর সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই অর্থ জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হতে পারে।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) দীর্ঘদিন ধরে জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়ে আসছে। কারণ নিবন্ধন ব্যয় কমলে আবাসন খাত আরও গতিশীল হবে এবং ক্রেতারাও উপকৃত হবেন। কিন্তু এই যৌক্তিক দাবিগুলো এখনো যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি।

বর্তমান বাস্তবতায় আবাসন খাতকে শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে চলবে না। এটি একটি সামাজিক ও মানবিক খাত, যা সরাসরি মানুষের মৌলিক অধিকার ও জীবনমানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সরকারের উচিত আবাসনবান্ধব করনীতি প্রণয়ন, নিবন্ধন ব্যয় হ্রাস, দীর্ঘমেয়াদি স্বল্পসুদের আবাসন ঋণ চালু, নির্মাণ সামগ্রীর ওপর কর যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা এবং সরকারি সেবাগুলোকে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের আওতায় আনা

একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনা, জলবায়ু সহনশীল আবাসন এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ একটি নিরাপদ বাসস্থান শুধু একটি ভবন নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের ভিত্তি।

বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করা মানে কেবল একটি খাতকে বাঁচিয়ে রাখা নয়; বরং একটি জাতির সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানবিক উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করা।

মোঃ জাকির হোসেন

ব্যবস্থাপনা পরিচালক

দরিয়া লিমিটেড।

Login

Register

Reset Password

Need an Account ? Register Here

Back to Login

Forgot Password ?